×
  • প্রকাশিত : ২০২২-০২-১৯
  • ৫৬৪ বার পঠিত
  • নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও অর্জন এখন দক্ষিণ এশিয়ায় মূল আলোচ্য বিষয়। গত তিন দশকের ব্যবধানে ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় আর্থসামাজিক ও অর্থনৈতিক ১৪টি সূচকে এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। জাতীয় আয়ে উৎপাদন খাতের অবদান বৃদ্ধি, কর্মক্ষেত্রে নারী অগ্রগতি ও নগরায়ণসহ নানা সুবিধার কারণে অর্থনৈতিক সূচকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা উপায়ে নারীরা অবদান রেখেছে, বিশেষ করে নারী তার শ্রমের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা করে আসছে। গত কয়েক দশকের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম নিয়ামক তৈরি পোশাক শিল্পের বিকাশে নারী পোশাক শ্রমিকদের অবদান অনস্বীকার্য, তবে পোশাক শিল্প ছাড়াও কৃষি কিংবা সেবা খাত, বিশেষ করে খামারবহির্ভূত কৃষি কিংবা ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের বিকাশে নারী শ্রমিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, যদিও সে অবদানের বিষয় খুব একটা আলোচিত হতে আমরা দেখি না। সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইনে নারী ব্যবসায়ী উদ্যোক্তার সংখ্যা অনেক বেড়েছে। ফেসবুকের ব্যাপক ব্যবহার ই-কমার্সের প্রসার ঘটিয়েছে বিশেষ করে অনলাইনে কেনাবেচার কারণে বেড়েছে নারী উদ্যোক্তা সংখ্যা। বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার ফেসবুক পেজ রয়েছে অনলাইন কেনাকাটা করার জন্য। এর মধ্যে প্রায় ১২ হাজার পেজ চালাচ্ছেন নারীরা। অল্প পুঁজিতে নারীরা অনলাইন ব্যবসার মাধ্যমে নিজেদের প্রকাশ করেছে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে। সরকারও নারী উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণের জন্য নানা ধরণের কর্মসূচী হাতে নিয়েছে। বর্তমানে ব্যাপক আলোচিত এমনই এক কর্মসূচীর নাম অল অ্যাবাউট সফট স্কিলস প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। বাংলাদেশের নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বছরব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি - অল অ্যাবাউট সফট স্কিলস সিরিজ ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়েছে। দেশের নারী উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক প্রচেষ্টার সুবিধার্থে প্রয়োজনীয় দক্ষতা প্রদানের লক্ষ্যে বছরব্যাপী অল অ্যাবাউট সফট স্কিলস শীর্ষক একটি সিরিজ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করছে বাংলাদেশের ভারতীয় হাই কমিশন। এ কার্যক্রমে তাদের সহযোগিতায করছে বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, মহিলা ও ই-কমার্স এবং সিল্কওক গ্লোবাল লিমিটেড। বাংলাদেশের নারী উদ্যোক্তাদের বিশেষ করে অনলাইনে নারী উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক প্রচেষ্টার সুবিধার্থে প্রয়োজনীয় দক্ষতা প্রদান করে সহায়তা করা এই কর্মসূচির লক্ষ্য বলে জানিয়েছে ভারতীয় হাই কমিশন। এটা অত্যন্ত আনন্দের যে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত আমাদের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় বিশেষ করে নারী অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখতে এগিয়ে এসেছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের অন্যান্য অনেক সেক্টরে ভারতীয় সহায়তা আমরা দেখছি, এবার নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে এমন ব্যতিক্রমধর্মী আয়োজন সত্যি প্রশংসার দাবীদার।

'অল অ্যাবাউট সফট স্কিলস ট্রেনিং কর্মসূচিটি 'বাংলাদেশের ৫০ বছর' উদযাপনের পাশাপাশি 'ভারতীয় স্বাধীনতার ৭৫ বছর' উদযাপন- 'আজাদী কা অমৃত মহোৎসব' এর অংশ। ২০২১ সালের ১ সেপ্টেম্বর আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এবং ভারতীয় হাইকমিশনার বিক্রম দোরাইস্বামী যৌথভাবে প্রশিক্ষণ সিরিজটির উদ্বোধন করেন। সিরিজের প্রথম প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ২ সেপ্টেম্বর ২০২১ তারিখে অনুষ্ঠিত হয়। বছরব্যাপী পরিচালিত সফট স্কিল ডেভেলপমেন্ট ট্রেনিং প্রোগ্রামটি অংশগ্রহণকারীদের যোগাযোগ দক্ষতা ও উপস্থাপনা দক্ষতা ইত্যাদি বিকাশে সহায়তা করবে। প্রশিক্ষণটি তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের জন্য উপকারী হবে।  গতবছর প্রথম দফাতেই ৭০০ জনের বেশি নারী উদ্যোক্তা নিবন্ধন করে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এই ট্রেনিং সরাসরি ও ভার্চুয়াল শিক্ষণ পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে। ভারতীয় হাইকমিশন বই ও ই-রিডার প্রদানের মাধ্যমে নারী ও ই-কমার্স কর্তৃক তাদের প্রাঙ্গণে স্থাপিত বিদ্যাসাগর গ্রন্থাগারে সহযোগিতা করছে। বাংলাদেশে দক্ষ ও গতিশীল নারী উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে নেওয়া বাস্তবসম্মত প্রচেষ্টাকে সমর্থনের অংশ হিসেবে ভারত 'অল অ্যাবাউট সফট স্কিলস' এর যাত্রা শুরু করেছে।

বর্তমানে অনলাইন ব্যবসার সঙ্গে অসংখ্য নারী জড়িত যাদের প্রায় সবাই শিক্ষিত। সংসারের চাপসহ নানা সমস্যার কারণে হয়তো তাদের পক্ষে চাকরি করা সম্ভব হয়নি। অনেক নারী রয়েছে যারা কিছু করবে বলে বদ্ধপরিকর তাদের জন্য অনলাইন কেনাকাটায় এনে দিয়েছে দারুণ সুযোগ। করোনাকালীন অনলাইনে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা যেমন বেড়েছে তেমনি বেড়েছে ভোক্তার সংখ্যা। ঘরে বসে অনলাইন ব্যবসার মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে পছন্দনীয় পণ্য ভোক্তা পেয়ে যাচ্ছে বিশ্বস্ততার মাধ্যমে। যারা কেনাবেচা করে তাদের কাছে ভোক্তা সব সময় আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়। ফেসবুকে ঢুকলেই চোখে পড়ে নারী উদ্যোক্তাদের সরব উপস্থিতি নানা রকম পণ্য নিয়ে। হাতে তৈরি পণ্য, বিভিন্ন রকমের পোশাক, প্রসাধনী, খাবারসহ নানান পণ্য। এসব কিছু পরিচালিত হচ্ছে নারী উদ্যোক্তাদের দ্বারা। অনলাইন-কেনাবেচায় নারী উদ্যোক্তার পাশাপাশি তুলনামূলকভাবে নারী ভোক্তার সংখ্যাও বেড়েছে। নারী উদ্যোক্তারা ঘরে বসে পণ্যের ছবি ফেসবুক পেজে দিচ্ছে, যেখান থেকে ভোক্তারা পছন্দের পণ্য বাছাই করে কল করে কিংবা খুদে বার্তা পাঠিয়ে পণ্যটি নিশ্চিত করছে। নারী উদ্যোক্তারা পণ্যটি ভোক্তার কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছে কুরিয়ার সার্ভিস কিংবা ডেলিভারি বয়ের মাধ্যমে। অনলাইনে কেনাবেচা ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়ের জন্য সহজ হয়ে গেছে। তবে এই অনলাইন ব্যবসাতে আরো কিভাবে প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করা যায় সেটা নিয়ে অনেকেই প্রশিক্ষণের কোন সুযোগ পাচ্ছিলেন না। ভারতীয় হাই কমিশনের এই অভিনব পরিকল্পনা অনলাইনে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।

সফট স্কিল ট্রেনিং ইতোমধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। গত ২৯ জানুয়ারি 'অল অ্যাবাউট সফট স্কিলস' ট্রেনিং এর সিরিজ কর্মসূচির আরেক দফা কার্যক্রমেও ব্যাপক হারে নারীদের অংশগ্রহণ দেখা গিয়েছে। ইন্দিরা গান্ধী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের ধানমন্ডি শাখায় দেখা যায়, ৩০ জন প্রশিক্ষণার্থী সরাসরি ক্লাসে অংশ নিয়েছেন এবং দেশের নানা প্রান্ত থেকে ৬০০ জন শিক্ষার্থী অনলাইনে যুক্ত হয়েছেন। রাজধানীর ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টারে এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। যেহেতু অনলাইনে বিজনেস করছেন নারীরা তাই ইন্টারনেট সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকাটা খুবই জরুরি। অনেকের ইন্টারনেট সম্পর্কিত ধারণা খুব একটা নেই। অনেক নারী উদ্যোক্তা আছেন মফস্বলে যারা সোশাল মিডিয়া বা ইন্টারনেট সম্পর্কে খুব বেশি জানেন না বা বিজনেস পরিচালনার জন্য অল্পস্বল্প জানেন কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। এমন সব উদ্যোক্তাদের জন্য এটি দারুণ উপকারী একটা ট্রেনিং। ফলে বছরব্যাপী শুরু হওয়া এই ট্রেনিং অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখছে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য। এই ট্রেনিংয়ে ইন্টারনেটের মাধ্যমে কীভাবে সহজে ব্যবসা করা যায়, সে বিষয়ে নারী উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। একইসঙ্গে গ্রাহকদের সঙ্গে ইমেইলের মাধ্যমে প্রতিবন্ধকতা ছাড়া যোগাযোগ করা যায়। সে বিষয়ে বিস্তারিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ট্রেনিংয়ের ক্লাসগুলো নিচ্ছে দক্ষ ট্রেইনাররা। ট্রেনিংয়ে মোট ১২টি ক্লাস রয়েছে। ট্রেনিং অংশগ্রহণকারী উদ্যেক্তারা প্রতি মাসে একটি করে ক্লাস করতে পারবেন। একইসঙ্গে সব ক্লাস করার পর তারা  সার্টিফিকেট পাবেন। উদ্যোক্তারা যেন তাদের উদ্যোগগুলো নিয়ে ভালোভাবে কথা বলতে পারেন, তাদের উদ্যোগকে ভালোভাবে ফুটিয়ে তোলা, তাদের উদ্যোগকে সবার সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ করা, এই  ব্যাপারগুলো শিখতে পারবেন এই সফট স্কিল ট্রেনিংয়ে।

 শ্রমনির্ভর থেকে জ্ঞাননির্ভর জাতিতে পরিণত হবার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রকল্প হাতে নিয়েছে অনেক আগেই। পৃথিবীতে যে বিশাল জ্ঞানভিত্তিক ডিজিটাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চলছে, বাংলাদেশ তার অংশীদার হতে চায়। নতুন ধরনের এই অর্থনীতিতে প্রবেশের মাধ্যমে নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সরকার সারা দেশে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। আইসিটি বা তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে পুরুষদের পাশাপশি নারীরাও সমান তালে এগিয়ে চলেছেন। কিছু দিন আগেও এ খাতের শিক্ষা, সেবা ও ব্যবসায় যারা নিয়োজিত ছিলেন, তাদের বেশিরভাগই ছিলেন পুরুষ। কিন্তু এখন আর সে অবস্থা নেই। ধীরে ধীরে চিত্র পাল্টেছে। বাংতথ্যপ্রযুক্তিলাদেশের নারীরা এগিয়ে এসেছেন তথ্য প্রযুক্তিতে। পোশাক শিল্প, ক্ষুদ্র ঋণ কর্মসূচি, চিকিৎসাসেবা, শিক্ষকতা, গবেষণা, ব্যাংকিংসহ অন্যান্য খাতে নারীর পদচারণা সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের মাত্র শতকরা ৪ ভাগ তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত। এ খাতে নারীর অংশগ্রহণ কম হলেও যোগ্যতায় পিছিয়ে নেই। তবে এখনও পর্যন্ত বেসরকারি খাতে নারীদের অংশগ্রহন বেশী। কম্পিউটার কৌশল, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও টেলিযোগাযোগ প্রকৌশলের মতো বিষয়গুলো নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। তাই অনলাইন ব্যবসার সাথে জড়িত নারীরাও কিভাবে আরো দক্ষ হয়ে উঠতে পারেন সেব্যাপারে সরকার ভাবছে। এবার এই ভাবনার সাথে তাল মিলিয়ে অল অ্যাবাউট সফট স্কিলস ট্রেনিং এর মাধ্যমে বন্ধুরাষ্ট্র ভারত আমাদের দিকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাচ্ছে। আমরা চাই, দ্বিপাক্ষিক সকল বাধা কাটিয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মাধ্যমে এগিয়ে যাক দুই দেশ। 


-হাসান ইবনে হামিদ,

রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক। 

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
ক্যালেন্ডার...

Sun
Mon
Tue
Wed
Thu
Fri
Sat