×
  • প্রকাশিত : ২০২২-১০-০৯
  • ২৫৮ বার পঠিত
  • নিজস্ব প্রতিবেদক

১৯৪৭ সাল, দুর্দন্ড প্রতাপশালী এক সাম্রাজ্য পরাজিত হয়েছিল সাদাসিধে পোশাকের এক ব্যক্তির কাছে। অহিংস মতবাদে বিশ্বাসী একজন সাধারণ মানুষ অসাধারণ এক আন্দোলনের সূচনা করে বিশ্ববাসীর হৃদয়মন্দিরে স্থান করে নিয়েছিলেন। মানবজাতিকে নৈতিক আহবান জানিয়ে শুদ্ধতম শক্তির পথ দেখিয়েছিলেন। তিনি মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী- অবিভক্ত ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা, অহিংস-অসহযোগ আন্দোলনের জনক, ভারতের জাতির পিতা। যিনি মহাত্মা গান্ধী হিসেবেই বেশি পরিচিত যার অর্থ হচ্ছে "মহান আত্মা"। গত ২ অক্টোবর এই মহান মানুষটির ১৫৩ তম জন্মদিন ছিলো। শুধু ভারত নয় বরং গোটা বিশ্বে এই দিনটি পালিত হয়েছে নানা আনুষ্ঠানিকতায়। কেননা এই মহান আত্মার মানুষটি যে এশিয়া থেকে আফ্রিকা, ইউরোপ থেকে আমেরিকাসহ গোটা পৃথিবীর মানুষকে অহিংস দীক্ষায় উজ্জীবিত করেছেন। আর তাই জাতিসংঘ সেই কর্মের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা জানিয়ে ২০০৭ সালে ২ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক অহিংস দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। সেই সময় থেকে এই দিনটি গোটা বিশ্বে পালিত হয়ে আসছে অহিংসতার প্রতীক হিসেবে।

১৮৬৯ সালের ২রা অক্টোবর ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজকীয় প্রাদেশিক এলাকা পোরবন্দরে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর জন্ম। গান্ধীর জীবনাচরণে পরিবারের একটা ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। নেতৃত্ব গুণাবলী এবং অহিংসতার শিক্ষা পরিবার থেকেই প্রাপ্ত। তাঁর বাবা ছিলেন প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রী। মা ছিলেন একজন অত্যন্ত ধার্মিক মহিলা, যিনি পুত্রের মধ্যে দৃঢ় হিন্দু নৈতিকতার সঞ্চার করেছিলেন। নিরামিষ ভোজন, ধর্মীয় সহনশীলতা, সহজ-সাধারণ জীবন-যাপন এবং অহিংসার উপর জোর দিয়েছিলেন তিনি। এই অহিংসতার শিক্ষা ছোটবেলাতে তিনি মায়ের কাছ থেকেই পেয়েছেন যা পরে নিজ অর্জিত শিক্ষার মাধ্যমে বিস্তার লাভ করেছে। তিনি গুজরাটের ভবনগরের সামাল দাস নামক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ম্যাট্রিকুলেশন ডিগ্রি নিয়ে ১৮৮৮ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি ব্যারিস্টারি পড়তে যান বিলেতে। ব্যারিস্টারি পাস করে ব্রিটিশ-ভারতীয় আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন। কিন্তু তিনি প্রথম মামলাতেই হেরে যান এবং ব্রিটিশ একজন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে তাকে বের করে দেয়া হয়। অপমানিত গান্ধী এসময় দক্ষিণ আফ্রিকায় একটি কাজের প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং ১৮৯৩ সালের এপ্রিল মাসে আফ্রিকার উদ্দেশ্যে ভারত ছাড়েন। পরবর্তী ২১ বছর তার সেখানেই কাটে। মহাত্মা গান্ধীর জীবনে বৃহৎ আকারে অহিংস নীতি-আদর্শ প্রয়োগ করেন দক্ষিণ আফ্রিকায় নিপীড়িত ভারতীয় সম্প্রদায়ের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে। এই অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সংযুক্ত হবার পেছনেও রয়েছে এক ভিন্ন ঘটনা। মহাত্মা গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকাতে অবস্থানের সময় একদিন ট্রেনে উঠেন এবং ট্রেনের প্রথম শ্রেণীর কামরাতে অবস্থান নেন কিন্তু সেখানে থেকে তাকে বের করে দেয়া হয় কেবলমাত্র গায়ের রং এর কারণে। ভারতীয় অভিবাসীদের প্রতি এই ধরনের আচরণে হতবাক ও ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি সেখানে নিপীড়ন বন্ধের লড়াই শুরু করেন এবং আত্মশুদ্ধির ধারণার প্রচার শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে ভারতে ফিরে এসে দুস্থ কৃষক মুটে-মজুরদের নিয়ে বৈষম্যমূলক কর আদায় ব্যবস্থা, বর্ণবৈষম্য ও কর্মবৈষম্যের বিরুদ্ধে অহিংস আন্দোলন গড়ে তোলেন। ভারতবাসীর দারিদ্র্য দূরীকরণ, নারী স্বাধীনতা বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণ জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে জোরদার করেন। ১৯৩০ সালে গান্ধীজি লবণ করের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে প্রায় চারশ কিলোমিটার দীর্ঘ ডান্ডি লবণ কুচকাওয়াজে নেতৃত্ব দেন। ওই আন্দোলন ১৯৪২ সালের ইংরেজ শাসকদের প্রত্যক্ষ ভারত ছাড় আন্দোলনের সূত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। ভারতীয় লোকজনের ওপর কর আরোপের প্রতিবাদে ধর্মঘট এবং মিছিল করার কারণে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়, কিন্তু ব্রিটিশরা ওই ট্যাক্স প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিল এবং গান্ধীকে মুক্তি দিয়েছিল। তাঁর এই বিজয় অর্জনের খবর ইংল্যান্ডে ছড়িয়ে পড়ে এবং গান্ধী একজন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত হতে শুরু করেন। এর আগে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডসহ অসংখ্য বিষয়ে ইংরেজ সরকারের দমন নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেন তিনি। ফলে দফায় দফায় জেল খাটতে হলো, রাষ্ট্রদ্রোহীতার মামলায় দেয়া হলো এবং জেল খাটলেন তিনি। ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ কূটচাল প্রসূত দাঙ্গা সংঘটিত হয়। হিন্দু-মুসলিম সে দাঙ্গায় অনেক মানুষ প্রাণ হারায়। দাঙ্গার আগুন ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। বর্তমান বাংলাদেশের নোয়াখালীতে এর ভয়াবহতার কথা জেনে গান্ধীজি ছুটে আসেন। তার প্রজ্ঞায় বন্ধ হয় দাঙ্গা। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ও ১৫ আগস্ট যথাক্রমে পাকিস্তান-ভারত নামে দ্বিজাতি তত্ত্বের আলোকে ভারত ভেঙে দুটি দেশের অভ্যুদয় ঘটে। স্বাধীনতা লাভের ছয় মাসের মধ্যে অর্থাৎ ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি তাকে হত্যা করে উগ্র ধর্মান্ধ এক যুবক। 

মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করলেও তাঁর আদর্শ, জীবন দর্শনকে হত্যা করা যায়নি। আর তাইতো তিনি আজো বেঁচে থাকেন প্রতিটি অহিংস আন্দোলনে, প্রতিটি মুক্তি সংগ্রামে। ২ অক্টোবর এই মহান মানুষটির জন্মদিন, তার একদিন পরেই অর্থাৎ ৩ অক্টোবর জার্মানি পালন করে তার জাতীয় দিবস, তার ঐক্যদিবসজার্মানীর এই জাতীয় দিবসটিতেও জড়িয়ে থাকে মহাত্মা গান্ধীর নাম। পূর্ব জার্মানির মানুষজন যেভাবে সম্পূর্ণ অহিংস উপায়ে পশ্চিম জার্মানির সঙ্গে এক হয়ে গেল, মহাত্মা গান্ধী বেঁচে থাকলে দেখে উল্লসিত হতেন। অবস্থান বিক্ষোভ, প্রতিবাদ সভা, গির্জার অনুষ্ঠান, বক্তৃতা সবকিছুই ছিল শান্তিপূর্ণ, সবকিছুই এগিয়েছে সর্বকালীন বৃহত্তর জনসমর্থনের দিকে, যতক্ষণ না সেসব গণ-আন্দোলনের চেহারা নিয়েছে। সম্পূর্ণ এমনই একটা প্রতিবাদের উপায় বেছে নিতেন মহাত্মা গান্ধী। বিক্ষোভকারীরা মহাত্মা গান্ধীর নাম উল্লেখ করেননি, কিন্তু প্রায়শই বলা হয়েছে যে, এটা তাঁর প্রভাব, মহাত্মা গান্ধীর প্রভাবেই এ-ধরনের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ সম্ভব হয়েছে আর তাতে সাফল্যও এসেছে।

মহাত্মা গান্ধী দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন মার্টিন লুথার কিং। আর তাইতো তিনি ১৯৫৯ সালে ভারতে পা রাখার পর বলেছিলেন, অন্য দেশে আমি পর্যটক হিসেবে যাই। তবে ভারতে আমি একজন তীর্থযাত্রী হিসেবে এসেছি। ভারতীয় ভূমি থেকেই সমাজে অহিংস পদ্ধতির প্রসার ঘটেছে। মন্টেগোমারি, অ্যালাবামায় এবং দক্ষিণ আমেরিকায় আমার লোকেরাও তাতে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। অহিংসার এই পদ্ধতিকে আমরা কার্যকরী ও দীর্ঘমেয়াদী মনে করেছি; নিঃসন্দেহে অত্যন্ত কার্যকরী! শুধু ভারত নয়, গান্ধীর অহিংস প্রতিরোধের বার্তা বহু আফ্রিকান দেশেও আশার আলো জাগিয়েছিল। ড. কিংয়ের কথায়, আমি যখন পশ্চিম আফ্রিকার ঘানাতে গিয়েছিলাম। প্রধানমন্ত্রী নক্রুমাহ আমায় জানিয়েছিলেন যে তিনি গান্ধীর কাজ সম্পর্কে পড়াশোনা করেছেন এবং অহিংসার মাধ্যমে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ তার দেশেও ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব বলে মনে করছেন। আমাদের মনে আছে, দক্ষিণ আফ্রিকায় বাস বয়কটও হয়েছিল। গান্ধীকে পবিত্র যোদ্ধা আখ্যা দিয়ে নেলসন ম্যান্ডেলা লিখেছিলেন, তার অসহযোগিতার কৌশল, নিশ্চিত ধারণা যে শাসকের সঙ্গে সহযোগিতা আদতে সেই শাসন স্বীকার এবং তার অহিংস প্রতিবাদ আমাদের দেশের ঔপনিবেশিক শাসন বিরোধী এবং বর্ণবিদ্বেষ বিরোধী আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করেছিল।

মহাত্মা গান্ধীর আদর্শ এশিয়াতেও ভিন্নমাত্রা পেয়েছে। বাংলাদেশে বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদানের প্রাক্কালে মহাত্মা গান্ধীর অহিংস-অসহযোগ আন্দোলনকে নতুন মাত্রা ও ব্যাপ্তি প্রদান করেছিলেন, যা বাংলাদেশে পাকিস্তানের ২৪ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনযন্ত্র সম্পূর্ণ অচল করে দিয়েছিলস্বাধীন মুক্ত হয়েছিলো বাংলাদেশ। তাই মহাত্মা গান্ধীর আদর্শকে সামনে রেখে ভারত-বাংলাদেশ তার মৌলিক আর জরুরি সমস্যাগুলোর সমাধান করুক, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। আমরা চাই, মহাত্মা গান্ধীর দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে আদর্শিক মানুষ হিসেবে, বাঙালি হিসেবে, ভারত-বাংলাদেশ বন্ধু হিসেবে এক সমাধানসূত্র নিয়ে সমানের সারিতে এসে দাঁড়াক যেখানে আমরা অহিংসতার গান গাইবো, মানবিকতার গান গাইবো সকল দ্বিপাক্ষিক সমস্যা সমাধানে। সত্যের অনুসরণের, অহিংসার অনুসরণের গতিময়তা অবশ্যই একটা উন্নততর পৃথিবী সৃষ্টি করবে এবং তা শুধু মানুষের জন্যে নয়, তা সমস্ত প্রাণিজগৎ আর প্রকৃতিজগতের জন্যে পরিবেশের জন্যেও

লেখক- -হাসান ইবনে হামিদ,

রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
ক্যালেন্ডার...

Sun
Mon
Tue
Wed
Thu
Fri
Sat