×
  • প্রকাশিত : ২০২৩-০১-১৭
  • ৮৭ বার পঠিত
  • নিজস্ব প্রতিবেদক

বিদায়ী ২০২২ সালে ১২ লাখ বাংলাদেশীকে ভারতীয় ভিসা দেওয়া হয়েছে। হাইকমিশন সূত্রে জানা যায়, কোভিড মহামারির আগে ২০১৯ সালে ১৬ লাখের বেশি বাংলাদেশি ভারতের ভিসা নেন। ২০২১ সালে লকডাউন সত্ত্বেও বাংলাদেশিদের জন্য ২ লাখ ৩০ হাজার ভিসা ইস্যু করে ভারত, যার মধ্যে ১ লাখ ৯৬ হাজার ছিল মেডিকেল ভিসা। কোভিডের কারণে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর, ২০২২ সালের মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে বাংলাদেশিদের জন্য আবারও চালু হয়েছে ভারতের টুরিস্ট ভিসা। নিয়ম-নীতি শিথিল হতে থাকলে বেনাপোল ও আখাউড়া স্থলবন্দরের ইমিগ্রেশন দিয়ে টুরিস্ট ভিসার অনুমতি দেয় ভারত সরকার। এরপর থেকে বাংলাদেশিদের ভারত ভ্রমণের সংখ্যা আবারও মহামারি শুরু হওয়ার আগের পর্যায়ে ফিরে গেছে।

 

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এই সংবাদটি অতীব গুরুত্ব বহন করে। কেননা এই দুই দেশের সম্পর্ক নানা সময় নানা কারণে উত্তপ্ত হয়ে উঠে। দুই দেশের সরকারের মাঝে দ্বি-পক্ষীয় সম্পর্ক ভালো থাকলেও জনগণের মাঝে সেই সুসম্পর্ক ততোটা পরিলক্ষিত হয়না! কারণ সাধারণ জনগণের মাঝে ভারত বিরোধী সেন্টিমেন্ট তৈরি করার লক্ষ্যে বাংলাদেশে থাকা ভারত বিরোধী একটি চক্র হরহামেশাই গুজবে লিপ্ত থাকে। সেটা হোক ধর্মীয় ইস্যু বা সীমান্ত ইস্যুতে। প্রতিবেশী দেশে যতো আনাগুনা বাড়বে ততোই বাংলাদেশের নাগরিকরা জানতে পারবে ভারতকে, ভারতের জনগণকে। তাই বিদায়ী বছরে এই বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশীর ভারতীয় ভিসা প্রাপ্তির ব্যাপারটি দুদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন বার্তা দিচ্ছে।

 

ভারতে যত বিদেশী পর্যটক যাচ্ছেন তার মধ্যে বাংলাদেশীরা শীর্ষস্থানে আছে। অর্থাৎ পর্যটন খাতে বাংলাদেশীদের কাছ থেকেই সবচাইতে বেশি মুদ্রা অর্জন করছে ভারত। শুধু তাই না, প্রচুর বাংলাদেশী ভারতে ব্যবসা চাকুরী করছে এবং সবচাইতে বেশি রেমিটেন্স ভারত থেকে নিয়ে আসছে বাংলাদেশীরাই। তাই শুধুমাত্র পর্যটনের উদ্দেশ্যে না বরং প্রতিনিয়ত তাদের যাতায়ত পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে। তাই আমাদের যাতায়তের সুবিধে অসুবিধের সাথে আমাদের যেমন স্বার্থ জড়িত ঠিক তেমনি তাদেরও। আমরা ভিসার জন্য যে ভোগান্তির শিকার হই তার থেকে উত্তরণ ঘটেছে এখন। লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে, ই-টোকেন সিস্টেমে ভিসা পেতে যে সমস্যা হতো তা থেকে এখন মুক্তি মিলেছে আমাদের। বাংলাদেশে ভারতীয় ভিসার আবেদনকারীদের ই-টোকেন সংগ্রহ করতে অপরিসীম ভোগান্তি ও অর্থদন্ড দিতে হতো। মধ্যবর্তী দালালরা হাতিয়ে নিতো বিপুল অর্থ। তাছাড়া ই-টোকেন পদ্ধতি নিয়ে বাংলাদেশে যে বিপুল অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল দিল্লী সে সম্পর্কে অনেক আগেই অবগত। তাই এই ভিসা প্রসেসকে সহজ ও দুর্নীতিমুক্ত করার জন্য অবিলম্বে ব্যবস্থা নেবার জন্যই তারা নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে। ভিসা ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, সুসংহত এবং সহজলভ্য করে তোলার জন্যই এই ই-টোকেন ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা হয়েছে। এমনকি বাংলাদেশে তাদের লোকবলের তুলনায় ভিসাপ্রার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি বলেই বিশ্বের বৃহত্তম ভারতীয় ভিসা সেন্টার খোলা হয়েছে বাংলাদেশে।  আর সে কারণেই পর্যটনের উদ্দেশ্যে বিপুল পরিমাণ জনগোষ্ঠী প্রতিবছর ভারতে যাচ্ছে, স্বল্প খরচে ভারত ভ্রমণ করছে।

 

ভারতের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ভারতে সবচাইতে বেশি বিদেশি পর্যটকের যাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এমনকি যুক্তরাষ্ট্রকেও ছাড়িয়ে প্রথম অবস্থানে চলে এসেছে। ২০১৬-১৭ সালে বাংলাদেশে ১৫ লাখের মতো ভারতীয় ভিসা ইস্যু হয়েছে। এর একটি বড় অংশই মেডিকেল ভিসা। মেডিকেল ট্যুরিজম থেকে ভারতের যে আয় হয় তারও একটি বড় অংশ আসে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া চিকিৎসা প্রত্যাশীদের কাছ থেকে। মাত্র কিছুদিন আগেও ভারতের ভিসা পেতে বেশ ভোগান্তির শিকার হতে হতো বাংলাদেশিদের। সেটি সহজ করার জন্য নানা ব্যবস্থা নিয়েছে ভারত। তার আওতায় এখন পাঁচ বছর পর্যন্ত ভিসা দেয়া হচ্ছে। দফায় দফায় পরিবর্তন করা হয়েছে নিয়ম। আবেদন জমা দেয়া প্রক্রিয়া সহজ করা, এমনকি বিশেষ উৎসব মৌসুমে বাংলাদেশীদের আকর্ষণ করতে পর্যটকদের জন্য নানা সুযোগ সুবিধা ও অফারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যেমন এইসব ব্যবস্থার মধ্যে আছে সীমান্ত চেকপোস্টে উষ্ণ ব্যবহার, চিকিৎসা সংক্রান্ত হয়রানির অভিযোগ জমা নেওয়া, হালাল খাবারের দোকান সম্পর্কে তথ্য দেয়া ইত্যাদি। এমনকি পশ্চিমবঙ্গ নেমেছে অন্য প্রদেশের সাথে প্রতিযোগিতায়। আর এর কারণই হল বাংলাদেশিরা ভারতে গিয়ে যে পরিমাণ অর্থ খরচ করেন। বাংলাদেশেরা ভারতে যাচ্ছেন মূলত ঘুরতে, কেনাকাটায় ও ডাক্তার দেখাতে। বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এর হিসেবে ২০১৭ সালে টুরিস্ট ভিসায় ভারতে যাওয়ার জন্য ৬০ মিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা কিনেছেন বাংলাদেশিরা যা আগের বছরের তুলনায় বেশি।

 

সম্প্রতি ভারতীয় ভিসা প্রক্রিয়া সহজ হওয়ায় প্রতি বছরই ভারতে বাংলাদেশিদের ভ্রমণ বাড়ছে। ভারতীয় হাইকমিশনের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত ১ কোটি ৩৭ লাখ ৩০ হাজার ২৮২ বিদেশি ভারত ভ্রমণ করেছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশির সংখ্যা ছিল ২৮ লাখ ৭৬ হাজার। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ১৮ লাখ ৬৩ হাজার ২৭৮, যুক্তরাজ্যের ১৩ লাখ ৬৯ হাজার ৫৪৮, কানাডার চার লাখ ৭৮ হাজার ২২৮, শ্রীলংকার চার লাখ ৫১ হাজার ৭৩৬, অস্ট্রেলিয়ার চার লাখ ৪৪ হাজার ৩৩, মালয়েশিয়ার চার লাখ ১১ হাজার ৫০, রাশিয়ার তিন লাখ ৭৭ হাজার ৮৩, চীনের তিন লাখ ৭৫ হাজার ৪৪৯ এবং জার্মানির তিন লাখ ৬০ হাজার ৮৪৩ নাগরিক ভারত ভ্রমণ করেন। ভারতে মোট বিদেশী পর্যটকের ৬৫ দশমিক ৬১ শতাংশ বাংলাদেশী। ভারতে ভ্রমণকারী বিদেশীদের সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ শীর্ষে আসে ২০১৫ সালে। এর আগে ২০১৪ সালে দ্বিতীয় এবং ২০১৩ ও ২০১২ সালে তৃতীয় অবস্থানে ছিল।

 

২০১৮ সালের ১৪ জুলাই রাজধানী ঢাকার যমুনা ফিউচার পার্কে ভারতীয় একটি ভিসা আবেদন কেন্দ্র উদ্বোধন করেছেন ভারত ও বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। যা কিনা বিশ্বের সবচাইতে বড় ভারতীয় ভিসা সেন্টার। ঢাকার বিলাসবহুল শপিং-মল যমুনা ফিউচার পার্কে সাড়ে আঠারো হাজার স্কয়ার ফিটের মতো বিশাল জায়গা জুড়ে তৈরি এই ভিসা সেন্টারটি তৈরি করা হয়েছে। নতুন ভিসা সেন্টারটি দেখতে রীতিমতো পাঁচ তারা হোটেলের লবির মতো। এই কেন্দ্রে রয়েছে ৪৮ টি কাউন্টার, চা-কফির জন্য ভেন্ডিং মেশিন, হালকা খাবারদাবার বিক্রির স্টল, এবং বয়স্ক ব্যক্তি ও নারীদের জন্য আলাদা কাউন্টার। আগে যেখানে রাস্তাতেই দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হবে সেখানে নতুন এই কেন্দ্রে রয়েছে এয়ার-কন্ডিশনিং সম্বলিত আরামদায়ক ওয়েটিং রুম। সেখানে আবেদন জমা নেওয়ার জন্য রয়েছে আটচল্লিশটি কাউন্টার। প্রবীণ নাগরিক, মহিলা ও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আলাদা কাউন্টারের ব্যবস্থা রয়েছে। ব্যবসায়িক ভিসার আবেদনের জন্যও পৃথক কাউন্টারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিদিন এখানে পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার পাসপোর্ট গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে। বাংলাদেশে থেকে যারা ভারতে যাচ্ছেন তাদের সংখ্যা প্রচুর বেড়ে যাওয়াতে আগে যে ভিসা সেন্টারগুলো ছিল তাতে আর কুলোচ্ছিল না। সেজন্য নতুন করে এই ভিসা সেন্টার খুলা ছিলো সময়ের দাবি। বর্তমানে বাংলাদেশে ১৫টি ভারতীয় ভিসা সেন্টার খোলা হয়েছে। বাংলাদেশের সব জেলার মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতেই এই ভিসা সেন্টারগুলো খোলা হয়েছে।  এখন বাংলাদেশীদের জন্য সিকিম ভ্রমণ উন্মুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে কাছে হিমালয়ের বরফ দেখার সুর্বণ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশীদের জন্য। এই নানামুখী উদ্যোগের ফলও ভারত সরকার পেয়েছে হাতেনাতে।  কয়েক বছর আগে যেখানে সাত থেকে আট লাখ ভিসা দেওয়া হতো, এখন তা ১৫ লাখে পৌঁছেছে। নিঃসন্দেহে এ এক বিরাট মাইলফলক।

 

কূটনীতিতে মানুষে মানুষে সম্পর্ক হলো সম্পর্কের ভিত্তি। কাছাকাছি দেশ, এত বড় সীমান্ত, স্বাভাবিকভাবেই যত লোক আসবেযাবে, সম্পর্ক ততই জোরালো হবে। ভারতে ভিসা জটিলতা কমে যাওয়া এবং সহজেই ভালো চিকিৎসা সেবা পাওয়া বাংলাদেশীদের যেমন ভারতমুখী করার একটি কারণ তেমনি পর্যটন, কমদামে কেনাকাটা, বৈচিত্রতাও একটা কারণ ভারতমুখী করার। এই যাওয়া আসার মাধ্যমেই দুই দেশের নাগরিকরা শক্ত বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে। সম্পর্ক জোরদারে দুই দেশ আগের চাইতে অনেক বেশি কার্যকরী ভূমিকা রাখছে এবং এর ফলাফলও হাতেনাতেই পাচ্ছে তারা। আমরা আশা রাখছি, সামনের সময়ে এই সম্পর্ক আরো ভিন্ন উচ্চতায় যাবে, কমে যাবে নাগরিকদের দূরত্ব, বাড়বে একে অপরের প্রতি ভালোবাসা।


লেখক- -হাসান ইবনে হামিদ, রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
ক্যালেন্ডার...

Sun
Mon
Tue
Wed
Thu
Fri
Sat