×
  • প্রকাশিত : ২০২৩-০৫-২৫
  • ১০৪ বার পঠিত
  • নিজস্ব প্রতিবেদক

‘মূর্খদের দেশে আবার কিসের বিশ্ববিদ্যালয়? এরা তো ঠিকমতো কথাই বলতে পারে না!’

গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন মহল থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিরুদ্ধে এমনি একটি বক্তব্য প্রচার করা হচ্ছে যে, তিনি নাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় সরাসরি বিরোধিতা করেছিলেন। ২০২০ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে এ বিষয়টি আবারও জোরালোভাবে আলোচনায় উঠে আসে। ২০২১ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার গৌরবোজ্জ্বল একশো বছর পূর্ণ করছে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ব্লগে কোনো রেফারেন্স ছাড়াই রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে বলা হচ্ছে যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তিনি নাকি বিরোধিতা করে বলেছেন। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে যারা জানেন এবং যারা তার লেখা ও কর্মের সঙ্গে পরিচিত তারা নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন এ ধরনের মন্তব্য কবিগুরুর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে যায় না। রবীন্দ্রনাথের সমস্ত সাহিত্যকর্ম ও বক্তৃতার কোথায় এ মন্তব্য করেছেন, এমন কোনো তথ্যসূত্র কেউ উল্লেখ না করেই অপবাদ দিয়ে তার বিরুদ্ধে বিষোদগার ছড়াচ্ছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা করেছিলেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ ধরনের অভিযোগের স্বপক্ষে যে যুক্তি তারা উল্লেখ করেন তা হলো,১৯১২ সালের ২৮শে মার্চ কলিকাতা গড়ের মাঠে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিবাদে এক বিশাল জনসভার আয়োজন করা হয়অনেকেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই জনসভার রেফারেন্স হিসেবে দিয়েছেন নীরদচন্দ্র চৌধুরীর লেখা বই Autobiography of an unknown Indian, আবার অনেকেই আবুল আসাদের একশো বছরের রাজনীতি বইয়ের রেফারেন্সও দিয়েছেন এখানে উল্লেখ করা দরকার, আবুল আসাদ একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত সংগঠন জামাতে ইসলামের এক পোটেনশিয়াল প্রোপার্টি। একাত্তরে বাঙালি গণহত্যাকে সমর্থন দিয়ে পাকিস্তান সরকারের পক্ষে কাজ করা সংবাদমাধ্যম দৈনিক সংগ্রামের সম্পাদক।

এদিকে নীরদচন্দ্র চৌধুরীর বইয়ে এমন কিছু উল্লেখ নেই আবার আবুল আসাদ কোন তথ্য উপাত্ত ছাড়াই এই অভিযোগটি করেছেন তারই ধারাবাহিকতায় ২০০০ সনে আহমদ পাবলিশিং হাউস থেকে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবাহিকতা এবং প্রাসঙ্গিক কিছু কথানামে একটি বইয়ে মেজর জেনারেল (অব.) এম এ মতিন, কপি পেষ্টের মাধ্যমে একই কথা উল্লেখ করেন কোন তথ্য উপাত্ত ছাড়াই এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কালি ও কলম পত্রিকার  সম্পাদক মণ্ডলীর অন্যতম সদস্য এজেড এম আব্দুল আলী একটি পত্রিকায়  এই অভিযোগটির বিরোধীতা করেন তিনি বলেন, যারা রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে এই অভিযোগটি করছেন তারা তাদের রচনায় কোনো সূত্রের উল্লেখ করেন নি  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করেছেন প্রফেসর রফিকুল ইসলাম তিনিঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশি বছরনামে বই লিখেছেন সেই বইয়ের কোথাও রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে এই ধরনের অভিযোগ পাওয়া যায় না  ঢাকা বিশ্বিদ্যালয়ের অধ্যাপক গীতিআরা নাসরীন জানাচ্ছেনরবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে এই  অপপ্রচারের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট বার্ষিক অধিবেশনের (২৮-২৯ জুন, ২০১১) আলোচনায় আসে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে দেয়া এই তথ্য যে সম্পূর্ণ মিথ্যা সে ব্যাপারে বিস্তারিত উল্লেখ আছে কার্যবিবরণীর ১৭৮ নং পৃষ্ঠায় অপরদিকে এই ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপ ড সৌমিত্র শেখর এই অভীযোগ যে মিথ্যা সে ব্যাপারেও মতামত দিয়েছেন,

 

এবার আসুন ১৯১২ সালের ২৮ মার্চের সমাবেশের দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক মূলত ঐ তারিখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সমাবেশে উপস্থিত তো দূরের কথা তিনি কোলকাতায়ই উপস্থিত ছিলেন না কবিগুরু যে ২৮ মার্চ কোলকাতায় ছিলেন না তার বড় প্রমাণ হলো প্রশান্তকুমার পাল রচিত ‘রবিজীবনী’ গ্রন্থ। গ্রন্থের ষষ্ঠ খণ্ডে উল্লেখ আছে, ‘এরপর বাকী ১৫ দিনে শিলাইদহে থেকে রবীন্দ্রনাথ আরও ১৭টি কবিতা বা গান লেখেন এবং ১২ এপ্রিল তিনি শিলাইদহ থেকে কোলকাতায় রওনা হন। এর মধ্যে একটি গান—আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ। ১৪ চৈত্র, ১৩১৮ বঙ্গাব্দ। রচনার স্থান শিলাইদহ। ২৬শে চৈত্র ১৩১৮(এপ্রিল ৮, ১৯১২) বঙ্গাব্দেও তিনি শিলাইদহে। ১২ এপ্রিল, ১৯১২ শিলাইদহ থেকে  তিনি কোলকাতায় রওনা হন।‘ অর্থাৎ ইতিহাসের সত্যতা উপস্থাপন করে এটা সম্পূর্ণ নিশ্চিত করে বলা যায়– সে সময়ে রবীন্দ্রনাথ কলকাতায় নয়—শিলাইদহে ছিলেন। বিশ্বভারতীতে সংরক্ষিত অনলাইন নথিতেও স্পষ্টভাবে দেখা যায়

১৯১২ সালের ২৮শে মার্চ রবীন্দ্রনাথ ছিলেন শিলাইদহে ১৯ মার্চ ১৯১২ (৬ চৈত্র, ১৩১৮ বঙ্গাব্দ) ভোরে কলকাতা থেকে সিটি অব প্যারিস জাহাজে রবীন্দ্রনাথের ইংল্যান্ড যাত্রার জন্য কেবিন ভাড়া করা হয়েছিল তার মালপত্রও জাহাজে উঠেছিল সেদিন সকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অসুস্থ হয়ে পড়েন ফলে তার ইংল্যান্ড যাত্রা স্থগিত হয়ে যায় রবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরপিতৃস্মৃতিগ্রন্থেও এই অসুস্থতার বিশদ বিবরণ দিয়েছেন এমনকি ঠাকুরবাড়ির ক্যাশবহিতেও এর লিখিত প্রমাণ আছে।

যারা এই প্রোপাগান্ডাটা করছেন তারা কি একবারো ভাবেন না যেঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা করলে নিশ্চয়ই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছরের মধ্যেই ভাষণ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ করা হত না ১৯৩৬ সালে তাকে ডিলিট উপাধী প্রদানের বিষয়েও বিরোধিতা হত বরং তাঁকে দুবারই মুসলমান-হিন্দু সকল শ্রেণীর ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান আন্তরিকভাবে  সম্মাননা প্রদান করেছে

পাকিস্তান আমলে রাষ্ট্রযন্ত্র মদদে বিশেষ গোষ্ঠী রবীন্দ্র বিরোধীতা করতো। যারা রবীন্দ্রনাথের কবিতা-গানে জীবনকে উপলব্ধি করে, তাদেরকে এক ঘরে করার অপচেষ্টায় “রবীন্দ্র পূজারী” শব্দটি সৃষ্টি করা হয়েছিলো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়। সেখানে পাকিস্তান সরকারের সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী স্বার্থ জড়িত ছিলো। ১৯৭১ সালের মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের স্বাধীনতা আসলেও আমাদের উপর থেকে পূর্বের ভূত এখনো সরেনি বা আমাদের দেশের বড় একটি অংশ এখনো পাকিস্তান ভাবধারার চিন্তা চেতনা থেকে সরে আসতে পারেনি।

লেখক- হাসান ইবনে হামিদ,

রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক। 

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
ক্যালেন্ডার...

Sun
Mon
Tue
Wed
Thu
Fri
Sat